২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম গোলটি এল মেক্সিকোর উইঙ্গার হুলিয়ান কিনিওনেসের পা থেকে। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচের শুরুতেই গোল করে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন মেক্সিকোর ১৬ নম্বর জার্সিধারী এই ফরোয়ার্ড।

ম্যাচের শুরু থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণে চাপ তৈরি করছিল মেক্সিকো। সেই চাপের ফল আসে নবম মিনিটে। নিজেদের রক্ষণভাগে বল হারায় দক্ষিণ আফ্রিকা। দ্রুত আক্রমণে যায় মেক্সিকো। সুযোগ পেয়ে নিচু ও জোরালো শটে বল জালে পাঠান কিনিওনেস। দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসের পায়ের ফাঁক দিয়ে বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আসতেকা।

এই গোল শুধু মেক্সিকোকে এগিয়ে দেয়নি, কিনিওনেসের নামও লিখে দিল ২০২৬ বিশ্বকাপের ইতিহাসে। প্রতিটি বিশ্বকাপেই প্রথম গোলদাতার নাম আলাদা করে মনে রাখা হয়। ১৯৩০ সালে লুসিয়েন লরাঁ করেছিলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোল। প্রায় এক শতাব্দী পর ২০২৬ আসরের প্রথম গোলদাতার জায়গায় এখন লেখা থাকবে কিনিওনেসের নাম।

কিন্তু কে এই কিনিওনেস?

হুলিয়ান কিনিওনেসের জন্ম কলম্বিয়ায়। পুরো নাম হুলিয়ান আন্দ্রেস কিনিওনেস কিনিওনেস। কলম্বিয়ায় জন্ম হলেও তাঁর পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের বড় অংশ গড়ে উঠেছে মেক্সিকোতে। মেক্সিকান ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি মেক্সিকোর নাগরিকত্ব নেন এবং পরে মেক্সিকো জাতীয় দলকে বেছে নেন।

মেক্সিকোয় তাঁর পথচলা শুরু তিগ্রেস দিয়ে। তবে তিগ্রেসের মূল দলে জায়গা পেতে শুরুটা সহজ ছিল না। এরপর ভেনাদোসে ধারে খেলেন, পরে লোবোস বুয়াপে গিয়ে নিজেকে নতুনভাবে চিনিয়ে দেন। গোল করার ক্ষমতা, শক্তিশালী দৌড়, শারীরিক উপস্থিতি এবং বক্সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে আলাদা করে তোলে।

পরের ধাপে আতলাস ও ক্লাব আমেরিকার হয়ে আরও বড় পরিচিতি পান কিনিওনেস। লিগা এমএক্সে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে মেক্সিকো জাতীয় দলের আলোচনায় নিয়ে আসে। তখন প্রশ্ন ছিল, তিনি কোন দেশকে বেছে নেবেন। জন্মসূত্রে কলম্বিয়ার হয়ে খেলতে পারতেন, কিন্তু কিনিওনেস অপেক্ষা করেন মেক্সিকোর জন্য।

২০২৩ সালে মেক্সিকো জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য খুলে যায়। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর কনকাকাফ নেশনস লিগে হন্ডুরাসের বিপক্ষে প্রথমবার মেক্সিকো দলে ডাক পান তিনি। সেই বছরই হন্ডুরাসের বিপক্ষে ম্যাচে এল ত্রির জার্সিতে তাঁর অভিষেক হয়।

কিনিওনেসের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরুতে বিতর্কও ছিল। মেক্সিকোর হয়ে স্বাভাবিকীকৃত ফুটবলারদের খেলা নিয়ে সে দেশে আলোচনা নতুন নয়। কেউ তাঁকে মেক্সিকোর আক্রমণের প্রয়োজনীয় শক্তি মনে করেছেন, কেউ আবার প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় দলের পরিচয় নিয়ে। কিন্তু কিনিওনেস মাঠে উত্তর দেওয়ার পথটাই বেছে নিয়েছেন।

বর্তমানে তিনি খেলছেন সৌদি আরবের আল-কাদসিয়ায়। সেখানে গোলের ধারাবাহিকতা তাঁকে বিশ্বকাপের আগে মেক্সিকোর আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র বানিয়েছে। তাঁর শক্তি শুধু গোল করা নয়; উইং থেকে ভেতরে ঢোকা, সেন্টার ফরোয়ার্ডের কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া, প্রেসিংয়ে অংশ নেওয়া এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে শারীরিক চাপে ফেলা—সব মিলিয়ে তিনি আক্রমণে বহুমাত্রিক বিকল্প।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে সেই বৈশিষ্ট্যই দেখা গেল। বল হারানোর পর মেক্সিকোর দ্রুত পুনরুদ্ধার, তারপর আক্রমণে গতি এবং শেষ মুহূর্তে কিনিওনেসের নির্ভুলতা—সব মিলিয়ে গোলটি ছিল আধুনিক ফুটবলের আদর্শ উদাহরণ।

মেক্সিকোর জন্য গোলটির তাৎপর্য আরও বড়। ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ তারা। ঘরের মাঠে, এস্তাদিও আসতেকার মতো ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামে, ৮০ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে টুর্নামেন্টের প্রথম গোল—এমন মুহূর্ত কোনো ফুটবলারের ক্যারিয়ারে একবারই আসে। কিনিওনেস সেটি কাজে লাগালেন।