দুস্থ ও অসহায় মানুষের আশ্রয় ও সহায়তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া মিল্টন সমাদ্দারকে ঘিরে ফের অভিযোগ উঠেছে। এবার এক বৃদ্ধ নারীকে চিকিৎসা ও আশ্রয়ের জন্য তার পরিচালিত ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’ প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে মারধর, ভয়ভীতি দেখানো এবং জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী ওই কনটেন্ট ক্রিয়েটরের নাম নাহিদ হাসান। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম উজান টিভিতে বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ করে পরিচিতি পেয়েছেন। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নিজেই মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর এসব অভিযোগ করেন।
নাহিদের দাবি, অসুস্থ এক বৃদ্ধ নারীর চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে তিনি টানা তিন থেকে চার দিন ধরে কাজ করছিলেন। পরে মানুষের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা সংগ্রহ করে ওই নারীকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তার উদ্দেশ্য ছিল বৃদ্ধাকে মিল্টন সমাদ্দারের পরিচালিত ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’ প্রতিষ্ঠানে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা।
নাহিদ জানান, শুরুতে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বৃদ্ধাকে রাখার জন্য মাসে ১৮ হাজার টাকা দাবি করা হয়। তারা ওই অর্থ দিতে রাজিও ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ওই নারীকে আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। বিষয়টি জানিয়ে নাহিদ ফেসবুকে আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে একটি পোস্ট করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে মিল্টন সমাদ্দার তাকে জিডি নিয়ে আসতে বলেন এবং বৃদ্ধাকে প্রতিষ্ঠানে রাখার আশ্বাস দেন বলে দাবি নাহিদের।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তিনি মিল্টন সমাদ্দারকে বিষয়টি জানান। পরে বুধবার রাত ২টা ৩৩ মিনিটের দিকে তারা মিল্টন সমাদ্দারের প্রতিষ্ঠানে পৌঁছান। সেখানে প্রথমে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার দেবাশীষের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত হন মিল্টন সমাদ্দার।
নাহিদের অভিযোগ, কথা বলার শুরুতেই মিল্টন সমাদ্দার তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টের কারণে তাকে নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে-এমন অভিযোগ তুলে মিল্টন সমাদ্দার তাকে গালিগালাজ করেন বলেও দাবি করেন তিনি।
একপর্যায়ে মিল্টন সমাদ্দার তার ওপর শারীরিকভাবে হামলা করেন বলে অভিযোগ নাহিদের। তার দাবি, মিল্টন সমাদ্দার তার গায়ে হাত তোলেন এবং চোখে আঘাত করেন। এ সময় তার গেঞ্জি ধরে চড় মারা হয়। এতে বুকে আঘাতের চিহ্ন হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। নিজের পোস্টে বুকে আঘাতের চিহ্নের একটি ছবিও প্রকাশ করেন নাহিদ।
নাহিদের আরও অভিযোগ, তাকে ছাড়িয়ে নিতে এগিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার দেবাশীষও তার গলা চেপে ধরেন। এতে তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল বলে দাবি করেন তিনি। একই সময়ে তার সঙ্গে থাকা ইলিয়াস নামের আরেক ব্যক্তিকেও মারধর করা হয় বলে জানান নাহিদ।
ঘটনার সময় সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন লোক উপস্থিত ছিলেন বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ। তার দাবি, তারা ছিলেন মাত্র তিনজন। মারধরের সময় প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি নির্জন এলাকায় হওয়ায় এবং সেখানে যাতায়াতের রাস্তা একটিই থাকায় তারা তাৎক্ষণিকভাবে বের হয়ে আসতে পারেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
নাহিদ বলেন, প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার রাস্তা ও সেখানকার পরিবেশ দেখে তার আগে থেকেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এ কারণে তিনি কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির কাছে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে রাখেন। পাশাপাশি মোবাইলে অডিও রেকর্ড চালু করে রাখেন। পুরো ঘটনার অডিও রেকর্ড তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
তার অভিযোগ, পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক একটি স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। সেখানে মিল্টন সমাদ্দারের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাদের কাছে কোনো টাকা-পয়সা চাওয়া হয়নি-এমন বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয় বলে দাবি করেন নাহিদ। ওই স্বীকারোক্তি প্রতিষ্ঠানটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে প্রকাশ করা হয়ে থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।
নাহিদের ভাষ্য, প্রাণভয়ে তিনি ওই স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মিল্টন সমাদ্দারের প্রতিষ্ঠানটি সাভার-আশুলিয়ার মাঝামাঝি একটি নির্জন এলাকায়। আমাদের ডাক-চিৎকার শোনার মতো আশপাশে কোনো মানুষ নেই। প্রাণ বাঁচানোর ভয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছি যে, তার প্রতিষ্ঠান থেকে আমাদের কাছে কোনো টাকা-পয়সা চাওয়া হয়নি।’
পরে বৃদ্ধা নারীকে ওই প্রতিষ্ঠানেই রেখে কোনোভাবে সেখান থেকে বের হয়ে আসেন বলে জানান নাহিদ। এরপর তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন। সেখানে তার চোখ পরীক্ষা ও এক্স-রে করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধও গ্রহণ করেছেন বলে জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে নাহিদ আরও লেখেন, এ ঘটনায় তিনি কারও কাছে বিচার চান না। তার আশঙ্কা, বিষয়টি নিয়ে কথা বলার কারণে উল্টো তাকেই হয়রানি করা হতে পারে কিংবা বিচারের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
তবে পরে এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় নাহিদ জানান, তিনি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি ভাবছেন। বুধবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরার কথাও জানান তিনি।
এদিকে, নাহিদের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিল্টন সমাদ্দারের ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’ প্রতিষ্ঠানের অফিসের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার কর্মীরা বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে চাননি। ফোন রিসিভ করা এক কর্মী জানান, তিনি এ বিষয়ে অবগত নন। ঘটনার সময় যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের সঙ্গে কথা বলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাতে কেউ ডিউটিতে ছিল না।’ মিল্টন সমাদ্দারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ওই কর্মী জানান, রাত ৮টার পর তাকে পাওয়া যেতে পারে। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগের কোনো নম্বর দিতে রাজি হননি তিনি।
মিল্টন সমাদ্দার এর আগেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন। দুস্থ ও অসহায় মানুষকে আশ্রয় দেওয়া, তাদের চিকিৎসা ও খাবারের ব্যবস্থা করার মতো মানবিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও নিয়মিত নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে প্রকাশ করতেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য সমাজের বিত্তবানদের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময় আর্থিক সহায়তা চাওয়া হতো তার প্রকাশিত ভিডিও ও পোস্টে।
তবে ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে এসব মানবিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে গুরুতর অনিয়ম ও অপরাধের অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধে ডেথ সার্টিফিকেট জালিয়াতি, মানবপাচার, আশ্রিত অসহায় ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের কিডনি বিক্রি, জমি দখল, আর্থিক হিসাবে অস্বচ্ছতা, আশ্রিতদের হিসাব-নিকাশে গরমিলসহ নানা অভিযোগের কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এ ছাড়া সাভারে জমি দখল, বরিশালে একটি চার্চ দখলের চেষ্টা, আশ্রিত বৃদ্ধদের যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়া এবং নিজের বাবা-মাকে মারধরের মতো অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ওঠে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। রাজধানীর মিরপুর থানায় করা মানবপাচার আইনের একটি মামলায় ওই বছরের ১৫ জুলাই তিনি জামিন পান।
তবে নাহিদের করা সর্বশেষ অভিযোগের বিষয়ে মিল্টন সমাদ্দারের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে মারধর, ভয়ভীতি দেখানো কিংবা জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।