ঢাকার কেরানীগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নাম ভাঙিয়ে দোকান মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কালিন্দী ইউনিয়নের স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। খাল খনন প্রকল্পের সুযোগ নিয়ে দোকান উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কেরানীগঞ্জের ভাগনা হিজলতলা এলাকায় দীঘিরপাড় খালের দুই পাশে গড়ে ওঠা দোকানপাট উচ্ছেদ করা হবে বলে প্রচার চালানো হয়। পরে দোকান মালিকদের জানানো হয়, ইউএনও ও এসিল্যান্ডকে ‘ম্যানেজ’ করা গেলে দোকানগুলো উচ্ছেদ হবে না। এ কথা বলে কালিন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক লিটন ঢালী, ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদ এবং যুবদল নেতা সবুজ বিভিন্ন দোকানির কাছ থেকে টাকা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকারি খাল খনন কার্যক্রম চলমান থাকায় দোকান উচ্ছেদের আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর দোকানভেদে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। অনেকের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হলে কয়েকজনকে সেই টাকা ফেরতও দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকান মালিক জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই এলাকায় ব্যবসা করছেন। খাল খননের সময় দোকান ভেঙে ফেলা হতে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যে লিটন ঢালী তাকে ডেকে নিয়ে বলেন, ইউএনও ও এসিল্যান্ডকে ১৫ লাখ টাকা দিলে দোকানগুলো রক্ষা করা সম্ভব। পরে বিভিন্ন দোকানির কাছ থেকে ওই অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “আমরা সাধারণ ব্যবসায়ী। অনেক কষ্ট করে দোকান চালিয়ে সংসার চালাই। হঠাৎ করে এত টাকা দাবি করায় আমরা চরম বিপাকে পড়েছি। একদিকে দোকান ভাঙার ভয়, অন্যদিকে টাকা না দিলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।”
আরেক ভুক্তভোগী জানান, খালের ময়লা পরিষ্কারের কথা বলে তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি জানতে পারেন, সরকারি উদ্যোগেই খাল পরিষ্কার করা হচ্ছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তার টাকা ফেরত দেওয়া হয়। তার দাবি, একই কৌশলে আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও অর্থ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে যুবদল নেতা সবুজের সঙ্গে এক ভুক্তভোগী দোকানির কথোপকথনের অডিও রেকর্ডে টাকা দাবি ও আদায়ের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। ওই রেকর্ড অনুযায়ী, এক দোকানির কাছে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে ৯০ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, খালের দুই পাড়ের অনেক দোকানির কাছ থেকেই অর্থ দাবি করা হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, সরকারি খননকাজ ও উচ্ছেদ কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে প্রশাসন। সেখানে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতাকর্মী কীভাবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে টাকা দাবি করেন, তা তদন্ত করে দেখা উচিত।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে স্থানীয় বিএনপির এক নেতা বলেন, অভিযোগে অভিযুক্ত লিটন ঢালী কালিন্দী ইউনিয়ন ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মিলন ঢালীর ছোট ভাই। অতীতে আওয়ামী লীগের সময়েও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এখন বিএনপির নাম ব্যবহার করে একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত লিটন ঢালী। তিনি বলেন, “স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। আমি কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নই।”
একইভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেন জাহিদও।
তবে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন যুবদল নেতা সবুজ। তিনি বলেন, “ওই এলাকায় আমারও জমি আছে। স্থানীয় বিএনপির এক নেতার নির্দেশে কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলাম। পরে সব টাকা ফেরতও দিয়েছি। যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি, তারা বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারবেন।”
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উমর ফারুক বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য আমান উল্লাহ আমানের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।