কৃষিভিত্তিক বরিশাল বিভাগের বিশাল অংশের জমি থেকে প্রত্যাশিত ফসল উৎপাদন হচ্ছে না। মৌসুমি জলাবদ্ধতা, প্রকৃত কৃষকের জমির মালিকানা সংকট, শ্রমিক সংকট থেকে শুরু করে ভাগাভাগির দ্বন্দ্ব, বিভিন্ন কারণে জেলার পর জেলাজুড়ে ফসলি জমি অনাবাদি পড়ে থাকে।
কৃষি গবেষক ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই উর্বর জমিগুলো উৎপাদনে না আসায় খাদ্যনিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকের আয়ের ওপর সরাসরি পড়ছে বিরূপ প্রভাব।

বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো বিভাগে বর্তমানে অনাবাদি পতিত জমির পরিমাণ ৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৫৬ হেক্টর। বিভাগে কৃষি মৌসুম তিন ভাগে বিভক্ত খরিপ–১, খরিপ–২ এবং রবি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জমি খরিপ–১ মৌসুমে অনাবাদি, যেখানে পতিত জমির পরিমাণ ৫ লাখ ৫১ হাজার ৮৯১ হেক্টর।
খরিপ–২ মৌসুমে অনাবাদি থাকে ৫২ হাজার ১৭৯ হেক্টর জমি, আর রবি মৌসুমে পতিত জমি ৫০ হাজার ১৮৬ হেক্টর।

জেলা–ভিত্তিক অনাবাদি জমি : বরিশাল জেলায় অনাবাদি পতিত জমি রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৭৩৩ হেক্টর। এর মধ্যে খরিপ–১ মৌসুমে ৯৭ হাজার ১৪৬ হেক্টর, খরিপ–২ মৌসুমে ২৮ হাজার ৮৩৭ হেক্টর ও রবি মৌসুমে মাত্র ২ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমি অনাবাদি থাকে।
ঝালকাঠিতে অনাবাদি জমির পরিমাণ ৫১ হাজার ৬৪৯ হেক্টর। তার মধ্যে খরিপ–১ মৌসুমে ৩৪ হাজার ৯৪১ হেক্টর, খরিপ–২ মৌসুমে ২ হাজার ৩৯৮ হেক্টর এবং রবি মৌসুমে ১৪ হাজার ৩১০ হেক্টর।
পিরোজপুরে রয়েছে ৮৪ হাজার ৮৫৫ হেক্টর পতিত জমি। খরিপ–১ মৌসুমে ৬১ হাজার ৬৭৬ হেক্টর, খরিপ–২ মৌসুমে ১০ হাজার ৫৮৩ হেক্টর এবং রবি মৌসুমে ১২ হাজার ৫৯৬ হেক্টর অনাবাদি থাকে।
পটুয়াখালী জেলায় অনাবাদি জমির পরিমাণ ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৪ হেক্টর। তার মধ্যে খরিপ–১ মৌসুমে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৫০ হেক্টর, খরিপ–২ মৌসুমে মাত্র ৬৩১ হেক্টর এবং রবি মৌসুমে ৯ হাজার ৮০৩ হেক্টর পতিত থাকে।
বরগুনায় অনাবাদি জমি ৮০ হাজার ৯৫৫ হেক্টর। এর মধ্যে খরিপ–১ মৌসুমে ৬৪ হাজার ৯৯৮ হেক্টর, খরিপ–২ মৌসুমে ৫ হাজার ২৩০ হেক্টর ও রবি মৌসুমে ১০ হাজার ৭২৭ হেক্টর অনাবাদি থাকে।
ভোলা জেলায় অনাবাদি জমি ১ লাখ ২১ হাজার ৮৮০ হেক্টর হলেও রবি মৌসুমে সেখানে অনাবাদি জমি নেই। খরিপ–১ মৌসুমে ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৮০ হেক্টর এবং খরিপ–২ মৌসুমে প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমি পতিত থাকে।

জমি অনাবাদি থাকার কারণ : বিভাগের একাধিক কৃষি কর্মকর্তার মতে, অনেক প্রকৃত কৃষকের নিজস্ব জমি নেই। তারা বর্গায় জমি চাষ করে থাকেন। মালিকের সঙ্গে ফসলের ভাগ নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই জমি ফাঁকা পড়ে যায়।
এ ছাড়া শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, বীজ ও সারসহ কৃষি উপকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অনেকে কৃষিজীবী পেশা ছেড়ে বিকল্প উপার্জনে ঝুঁকছেন। ফলেই জমির বড় অংশ অনাবাদি থাকে।

বর্গাচাষে দ্বন্দ্ব ও চাষির আগ্রহ হারাচ্ছে মাঠ : মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা জানান, বিভাগের অনেক প্রকৃত কৃষকের নিজের জমি নেই। তারা অন্যের জমি বর্গায় চাষ করেন। কিন্তু ফসলের ভাগাভাগি, জমির ভাড়া ও উৎপাদন খরচ নিয়ে মালিকের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে জমি অব্যবহৃত পড়ে থাকে।
এ ছাড়া শ্রমিকের মজুরি, বীজ, সার ও সেচের ব্যয় বছর বছর বাড়ছে। ফলে কৃষকরা আবাদের খরচ তুলতে না পারায় চাষের ঝুঁকি নিতে চান না।
“অনেকে কৃষি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। এর প্রভাব সরাসরি জমির ওপর পড়ছে, এমন মন্তব্য করেন এক কৃষি কর্মকর্তা।
জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন ও বন্যা, প্রাকৃতিক বাধায় থমকে যায় চাষাবাদ।

বরিশাল কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তা বিন রফিক বলেন, কয়েক বছর আগেও বরিশাল অঞ্চলে অনাবাদি জমির পরিমাণ আরও বেশি ছিল। কৃষি অফিসের মাঠপর্যায়ের নজরদারি, চাষাবাদ উৎসাহ এবং কৃষিসেবামূলক পরামর্শের মাধ্যমে জমির একটি অংশ চাষের আওতায় এসেছে। তবে বর্তমানে যে জমি অনাবাদি রয়েছে তার সিংহভাগই প্রাকৃতিক কারণভিত্তিক।
নিচু জমিতে পানি জমে থাকা, নদীভাঙনের মুখে থাকা, বা ঘাসজাতীয় কণ্টকাকীর্ণ উদ্ভিদের বিস্তার।এসব কারণে জমিতে চাষ করা যায় না। সময়ের সঙ্গে এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি অর্থনীতি : বিশেষজ্ঞদের মতে, অনাবাদি জমির এই পরিমাণ বরিশাল বিভাগের কৃষি অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। ধান, ডাল, তেলবীজ বা শাকসবজির সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কৃষকের আয় কমছে এবং বাজারে চাপ বাড়ছে।
এ ছাড়া স্থানীয় খাদ্যশস্যের ঘাটতি পূরণে বাইরে থেকে পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে নির্ভরশীল করে তুলছে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বর্গা ব্যবস্থার সংস্কার, ঋণ সহজীকরণ ও প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ, এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বরিশালের বিশাল অনাবাদি জমি আবারও উৎপাদনমুখী হতে পারে।
প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাও বড় বাধা : কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তা বিন রফিক বলেন, আগে বরিশাল অঞ্চলে অনাবাদি জমির পরিমাণ আরও বেশি ছিল। কৃষি অফিসের বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরামর্শে এ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে বিভাগের যে জমিগুলো অনাবাদি পড়ে রয়েছে তার অধিকাংশই প্রাকৃতিক কারণে। এর মধ্যে রয়েছে—নিচু জমিতে পানি জমে থাকা, নদীভাঙনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, ঘাসজাতীয় উদ্ভিদে আচ্ছাদিত জমি ইত্যাদি। এসব কারণে কৃষকেরা চাষাবাদে এগোতে পারেন না।
বিন রফিক আশা প্রকাশ করেন, কৃষক ও কৃষি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আগামী মৌসুমগুলোতে অনাবাদি জমির পরিমাণ আরও কমবে।

কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর বরিশাল অঞ্চল এর অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মাদ নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, অমাদের লক্ষমাত্রা শতভাগ না হলেও ৯৯ ভাগ পুরন হচ্ছে। তবে অনাবাদি জমির কারন কৃষক ও জমির মালিক এর মধ্যকার বিষয়। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন এর ফলে জলাবদ্ধতা এর জন্য অধিকতর দায়ী। তিনি বলেন আমরা কৃসকদের সাথে এই বিষয় নিয়ে কাজকি যাতে একটুরো জমিও অনাবাদি না থাকে।