সাব্বির, জাবি প্রতিনিধি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আবাসিক ব্যবস্থার উন্নয়নের অংশ হিসেবে নবনির্মিত ছয়টি হলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গ্যাস সংযোগ প্রদান করা হলেও এখনো ডাইনিং সুবিধা চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর ফলে নতুন হলগুলোতে বসবাসরত প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন খাবার সংকটে পড়ছে। সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে উচ্চমূল্যে খাবার কিনছে, যা তাদের স্বাভাবিক ছাত্রজীবনে চরম ভোগান্তি তৈরি করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৪৪২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দশতলাবিশিষ্ট ছয়টি হলের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এই হলগুলো হলো— বেগম রোকেয়া হল, তারামন বিবি হল, ফেলানি খাতুন হল (পূর্ব নাম ফজিলাতুন্নেছা), শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল, নবাব সলিমুল্লাহ হল (পূর্ব নাম শেখ রাসেল) ও কাজী নজরুল ইসলাম হল। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর প্রায় দুই বছর আগে শিক্ষার্থীদের তুলে দেওয়া হলেও রান্নার ব্যবস্থা না থাকায় ডাইনিংগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে।
দীর্ঘ তিন বছর ধরে গ্যাস সংযোগের বিষয়টি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মেহেদি মামুনের বিশেষ তৎপরতা ও নিরলস প্রচেষ্টায় গ্যাস সংযোগের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। গত ১৪ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ নতুন ছয়টি হলে সংযোগ প্রদান করে। এরপর প্রায় ১ মাস পার হয়ে গেলেও হলের ডাইনিংয়ের চুলা এখনো জ্বলেনি।
ডাইনিং সুবিধা না থাকায় এই ছয় হলের প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থীকে খাবারের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে হলের বাইরের খাবারের দোকান ও বটতলার হোটেলগুলোর ওপর। ডাইনিংয়ে ২৫-৩০ টাকায় যে খাবার পাওয়া যেত, বাইরে তা কিনতে শিক্ষার্থীদের খরচ হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি মানহীন খাবার খেয়ে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বটতলার হোটেলগুলো ও হলের সামনে দোকানের নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই পেটের পীড়া ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগছে। অনেকে নিরুপায় হয়ে পড়াশোনার সময় নষ্ট করে ইলেকট্রিক হিটার বা রাইস কুকারে নিজেদের কক্ষে রান্না করছেন, যা হলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়াও নারী শিক্ষার্থীরা বাইরে খাবার খেতে হলেও দূর বটে এসে অথবা অন্য হলের ক্যান্টিনে গিয়ে খেতে হয়, যার জন্য মেয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি আরো বেশি।
এই বিষয়ে কাজী নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আঁখিরুজ্জামান রিফাত (৫৩ তম ব্যাচ, ইংরেজি বিভাগ) বলেন, “আমরা সম্পূর্ণ আবাসিক সুবিধা পাওয়ার কথা শুনে এই হলে উঠেছি। কিন্তু ডাইনিং না থাকায় আমাদের প্রতিদিন খাবার খাওয়া নিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। গ্যাস সংযোগ আসার খবরে আমরা খুশি হয়েছিলাম, কিন্তু এখনো ডাইনিং কেন বন্ধ তার কোনো সদুত্তর প্রশাসন দিতে পারছে না।”
একই হলের হল সংসদের ভিপি মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, ডাইনিং চালু করতে প্রয়োজনীয় লোকবল সংকট রয়েছে। ডাইনিং এ শুধুমাত্র দুজন কর্মচারী নিযুক্ত আছেন।
এ অবস্থায় খুব দ্রুত কর্মচারী নিয়োগের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। তারামন বিবি হলেও একই সংকটের কথা জানিয়েছেন হলের জিএস প্রিয়াঙ্কা কর্মকার।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, “গ্যাস পাওয়ার পরেও ডাইনিং চালু না হওয়াটা প্রশাসনের উদাসীনতা। সিন্ডিকেটে পাস হবার পরও প্রশাসন কেন ডাইনিং এ জনবল নিয়োগ নিয়ে গরিমসি করছে সেটা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। পরের মিটিংয়েই আমরা বিষয়টি নিয়ে জোরদাবি তুলবো।”
এদিকে তারামন বিবি হলের প্রভোস্ট ও প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবেদা সুলতানা বর্তমান পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে বলেন, “নতুন হলগুলোর ডাইনিং চালুর বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় আছে। নতুন হলগুলোতে গ্যাস এলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ডাইনিং অ্যাসিস্ট্যান্টের সংকট রয়েছে, এমনকি আমার নিজের হলেও একই সমস্যা। আমি দ্রুতই সব হলের প্রভোস্টদের সাথে কথা বলে যত দ্রুত সম্ভব ডাইনিংগুলো সচল করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সোহেল আহমেদ বলেন, “দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আমরা তিতাস গ্যাসের সংযোগ পেয়েছি। এখন ডাইনিং পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ এবং ডাইনিংয়ের ফার্নিচার ও সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলছে। প্রতিটি হল প্রভোস্টকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। আশা করছি খুব শীঘ্রই শিক্ষার্থীরা ডাইনিং সুবিধা পাবেন।”
প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুততম সময়ে ডাইনিং চালুর বিষয়ে নতুন হলের শিক্ষার্থীরা জোর দাবি জানিয়েছেন।