নিজস্ব প্রতিবেদক:
নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলীর আকাশ পানে তাকালে এখন আর নীল দিগন্ত দেখার জো নেই। চারদিকে দড়িতে ঝুলছে শত শত বিশালকায় ডিজিটাল ব্যানার। পরিবেশ রক্ষা এবং সুশৃঙ্খল নির্বাচনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালার ৭ নম্বর বিধিতে অপচনশীল উপাদানে প্রচারণা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। প্রার্থীরা যেন নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সরাসরি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই শহরজুড়ে এই পিভিসি ও প্লাস্টিক ব্যানারের উৎসব শুরু করেছেন।
নির্বাচনী আচরণ বিধিমালার ৭ (খ) উপ-বিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, নির্বাচনি প্রচারণায় অপচনশীল দ্রব্য যেমন—রেক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিক তথা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এরূপ কোনো উপাদানে তৈরি প্রচারপত্র, ফেস্টুন ও ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে দড়িতে টাঙানো অধিধকাংশ ব্যানারই তৈরি করা হয়েছে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পিভিসি (পলিভিনাইল ক্লোরাইড) বা প্লাস্টিক উপাদান দিয়ে। শুধু তাই নয়, আচরণ বিধিমালার ৭ (গ) ধারাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এসব ব্যানার টাঙানো হয়েছে গাছ, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি এবং নানা স্থাপনায়।
মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, কাগজের পোস্টার ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রার্থীরা এখন ডিজিটাল ব্যানারের দিকে ঝুঁকেছেন। তবে বিধি অনুযায়ী পচনশীল কাপড়ে ব্যানার করার কথা থাকলেও খরচ বাঁচাতে ও স্থায়িত্ব বাড়াতে প্রার্থীরা দেদারছে ব্যবহার করছেন নিষিদ্ধ প্লাস্টিক পিভিসি। পরিবেশবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, নির্বাচনের পর এই বিশাল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য নর্দমাগুলোতে আটকা পড়ে পুরো শহরকে এক ভয়াবহ জলাবদ্ধতার দিকে ঠেলে দেবে ও পরিবেশের ক্ষতি সাধন করবে। সাধারণ ভোটারদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, যারা শুরুতেই আইনের তোয়াক্কা করছেন না, তাঁরা নির্বাচিত হওয়ার পর পরিবেশ রক্ষায় কতটুকু আন্তরিক থাকবেন?
মাঠের এই আইন অমান্য করার পাশাপাশি ডিজিটাল জগতেও চলছে এক ধরনের লুকোচুরি। আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রার্থীকে তাঁদের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের (ফেসবুক, ইউটিউব) অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল নম্বর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নারায়ণগঞ্জের প্রার্থীরা তা মানছেন না।
রবিবার বিকেলে মুঠোফোনে নারায়ণগঞ্জ জেলা নির্বাচন কমিশনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. রকিবুজ্জামান রেনু নিশ্চিত করে জানান, নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনে তারা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করবেন। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারে এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থীই তাঁদের ডিজিটাল প্রচারণার কোনো তথ্য নির্বাচন অফিসে জমা দেননি।
অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারে নামে-বেনামে অসংখ্য ফেসবুক পেজ ও ‘ব্লু-টিক’ ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত ভিডিও ও ছবি দিয়ে প্রচারণা চলছে। তথ্য জমা না দেওয়ায় এসব অনলাইন প্রচারণা মনিটরিং করা বা অপপ্রচার রোধ করা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনী আচরণবিধির তোয়াক্কা না করে ডিজিটাল ব্যানার আর গোপন ভার্চুয়াল প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীরা, যা প্রশাসনের অসহায়ত্বকেই ফুটিয়ে তুলছে।