রমজান মাস এলেই রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক ভিন্ন আবহ। প্রতিদিন বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো রোজাদার এখানে একত্রিত হন ইফতার করতে। ধনী-গরিব, ছিন্নমূল, শ্রমজীবী কিংবা প্রতিবন্ধী—সব ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে বসে ইফতার করার এই দৃশ্য মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছরের মতো এবারও রমজানজুড়ে মসজিদে ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে। রমজানের প্রথম দিনেই কয়েক হাজারের বেশি মুসল্লি এখানে ইফতারে অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ইফতারে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। প্রায় আট-নয় বছর ধরে নিয়মিতভাবে মুসল্লিদের জন্য এই আয়োজন করে আসছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) প্রথম রমজানের ইফতারের সময় মসজিদে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদের পূর্ব সাহানে (পূর্বাংশে) সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন হাজারো মুসল্লি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা মুসল্লিদের মাঝে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করছেন। পাশেই অস্থায়ী মঞ্চে চলছিল কোরআন তিলাওয়াত, হামদ ও নাত পাঠ। আসরের নামাজের পর থেকেই ধাপে ধাপে মুসল্লিরা ইফতারের জন্য জড়ো হতে থাকেন।

পুরানা পল্টনের এক কার্পেট ব্যবসায়ী বলেন, “প্রতিদিন দোকানেই ইফতার করি। তবে এবারের প্রথম রমজানে বায়তুল মোকাররমে ইফতার করার সুযোগ পেয়েছি। হাজারো মুসল্লির সঙ্গে একসাথে ইফতার করতে পেরে অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে।”

ইফতারে অংশ নেওয়া রিপন নামের আরেক মুসল্লি বলেন, “আমি প্রতি বছর চেষ্টা করি প্রথম রমজানে এখানে ইফতার করতে। এখানে এসে মনে হয়, আমরা সবাই এক ও অভিন্ন। ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই একসাথে দোয়া-মোনাজাত করে ইফতার করি, যা আমাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে।”

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা জানান, “প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক মুসল্লি এখানে ইফতার করতে আসেন। এছাড়া ভাসমান ও অসহায় অনেক মানুষও এখানে ইফতার করেন। তাদের কথা বিবেচনায় রেখেই এই আয়োজন করা হয়। প্রতিদিনের ইফতার আয়োজনের জন্য প্রায় এক লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট আরও বাড়ানো হয়।”

এছাড়া মসজিদের পূর্ব সাহানের ডান পাশে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ মুসল্লি কমিটি ও মসজিদ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি মানুষের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। একই সময়ে তাবলিগ জামাতের উদ্যোগেও চার শতাধিক মানুষের জন্য পৃথক ইফতার আয়োজন করা হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোজাদার এখানে ইফতারে অংশ নেন।

ইফতারের পূর্বমুহূর্তে মুসল্লিরা মহান আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে দোয়া করেন। আজানের ধ্বনি শোনা মাত্রই ‘বিসমিল্লাহ’ বলে সবাই একসঙ্গে ইফতার শুরু করেন। ইফতার শেষে মাগরিবের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে রোজাদাররা তাদের দিনের সিয়াম সম্পন্ন করেন।

রমজানের এই সম্মিলিত ইফতার শুধু ক্ষুধা নিবারণের আয়োজন নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়।