• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা কেরানীগঞ্জে আমান প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত ১ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে স্ত্রী হত্যার অভিযোগে স্বামী গ্রেপ্তার ‘মজা করে কমেন্ট করেছি’, প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে মন্তব্যে যুবকের ৭ দিনের রিমান্ড সেই মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘মিথ্যা’ দাবি আইনজীবীর ওয়েবসাইট বন্ধ রেখেও সাইবার হামলার শিকার জনতা ব্যাংক কেরানীগঞ্জে যুব মহিলা লীগ নেত্রী হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, গ্রেফতার ৩ কেরানীগঞ্জে পরিত্যক্ত ভবনের পাশে অজ্ঞাত কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার ইরানে দ্বিতীয় দফা যুদ্ধের শঙ্কা, বিপদে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বাস খাদে পড়ে নিহত ৩, আহত ১৬

১৯ বছর ধরে বজ্রপাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন স্কুল শিক্ষক তাজ-উল 

রানা আহমেদ
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
স্কুল শিক্ষক মো. তাজ-উল ইসলাম চৌধুরী তাকে নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত সাংবাদগুলো প্রতিবেদক রানা আহমেদকে দেখাচ্ছেন । ছবি : এনভি নিউজ২৪

সকালের নরম রোদ তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়কে। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছগুলো যেন পথচারীদের স্বাগত জানায়। কোথাও কচি পাতা বাতাসে দুলছে, কোথাও আবার পূর্ণবয়স্ক গাছে ঝুলছে তাল। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজেই এঁকেছে সবুজের এক দীর্ঘ ক্যানভাস।

কিন্তু এই দৃশ্য কোনো সরকারি প্রকল্পের ফল নয়, নয় কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ। এর পেছনে রয়েছে একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষকের অসাধারণ গল্প।

তিনি মো. তাজ-উল ইসলাম চৌধুরী। কেরানীগঞ্জ উপজেলার কোন্ডা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় শিক্ষক হলেও গত প্রায় দুই দশক ধরে তিনি হয়ে উঠেছেন পরিবেশের এক নীরব যোদ্ধা। ১৯ বছরে তিনি নিজ হাতে বুনেছেন প্রায় চার হাজার তালবীজ। যার মধ্যে শত শত গাছ আজ ছায়া দিচ্ছে, ফল দিচ্ছে এবং বদলে দিচ্ছে পুরো এলাকার পরিবেশ।

১৯৯৮ সালে ছাত্রাবস্থায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নূতন কুঁড়ি স্কুল’। তখন থেকেই শিক্ষার পাশাপাশি সমাজের জন্য কিছু করার তাগিদ ছিল তার মধ্যে। সময়ের সঙ্গে সেই ভাবনা রূপ নেয় বৃক্ষপ্রেমে।

ফলদ, বনজ ও ঔষধি—বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগিয়েছেন তিনি। তবে তালগাছের প্রতি তার বিশেষ ভালোবাসা তৈরি হয় পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে জানার পর।

তাজ-উল ইসলাম বলেন, “ছোটবেলায় চারপাশে অসংখ্য তালগাছ দেখেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে সেগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। তখন ভাবলাম, কেউ না কেউ তো এগিয়ে আসতে হবে।”

সেই ভাবনা থেকেই ২০০৮ সালে শুরু হয় তার তালবীজ বোনার যাত্রা।

কোনো প্রকল্প নেই, নেই সরকারি বরাদ্দ। নিজের অর্থ, নিজের শ্রম আর একরাশ ভালোবাসা নিয়ে তিনি সংগ্রহ করেছেন তালবীজ। তারপর সেগুলো বুনেছেন রাস্তার ধারে, খোলা জায়গায়, পরিত্যক্ত জমিতে কিংবা যেখানে গাছ বেড়ে ওঠার সুযোগ আছে। বছরের পর বছর একই কাজ করে গেছেন নিঃশব্দে।

অনেক বীজ নষ্ট হয়েছে, কিছু চারা টিকেনি। তবুও থেমে যাননি। কারণ তিনি জানতেন, একটি গাছ বড় হতে সময় লাগে; আর একটি স্বপ্ন বাস্তব হতে লাগে আরও বেশি ধৈর্য।

আজ তার লাগানো প্রায় চার হাজার বীজের মধ্যে চার শতাধিক তালগাছ বিভিন্ন স্থানে দৃশ্যমান। অনেক গাছ পূর্ণতা পেয়েছে, ফলও দিচ্ছে নিয়মিত।

পরিবেশবিদদের মতে, তালগাছ মাটির ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা বাড়ার পর তালগাছ রোপণের গুরুত্ব আরও বেশি আলোচনায় এসেছে।

তাজ-উল ইসলামের কাছে তাই তালগাছ শুধু একটি গাছ নয়; এটি আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া নিরাপদ পরিবেশের প্রতীক।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও এলাকার অনেক রাস্তার পাশে তেমন গাছ ছিল না। এখন তালগাছের সারি শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার পরিবেশ।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আশিক বলেন, “প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাই। আগে এমন সবুজ পরিবেশ ছিল না। এখন রাস্তার দুই পাশে তালগাছ দেখে মন ভালো হয়ে যায়। একজন মানুষ যে এত বড় পরিবর্তন আনতে পারেন, তাজ-উল ইসলাম তার উদাহরণ।”

কোন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোহাম্মদ ইফতেখারুল ইসলামও তার উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, “তিনি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় পরিবেশ রক্ষায় অসাধারণ অবদান রাখছেন। ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণেও তার লাগানো বেশ কয়েকটি তালগাছ রয়েছে, যেগুলো এখন ফল দিচ্ছে। তার কাজ অন্যদের জন্য অনুকরণীয়।”

নিজের কাজের জন্য কোনো পুরস্কার বা স্বীকৃতির প্রত্যাশা নেই তাজ-উল ইসলামের। বরং তার আনন্দের জায়গা অন্যখানে। তিনি বলেন, “যখন দেখি পথের মানুষ আমার লাগানো গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে, তখন মনে হয় আমার পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। আর গাছে ফল ধরলে সেই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না,”

অনেকেই মনে করেন পরিবেশ রক্ষার জন্য বড় বাজেট, বড় প্রকল্প বা বড় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। কিন্তু কেরানীগঞ্জের এই শিক্ষক দেখিয়ে দিয়েছেন, একজন মানুষের ইচ্ছাশক্তিও একটি জনপদের চেহারা বদলে দিতে পারে।

কোন্ডা ইউনিয়নের পথে পথে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত তালগাছ আজ শুধু সবুজের প্রতীক নয়; এগুলো এক শিক্ষকের স্বপ্ন, দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি ভালোবাসার জীবন্ত সাক্ষী।

প্রকৃতির কাছে মানুষের ঋণ শোধ করা হয়তো সম্ভব নয়। তবে তাজ-উল ইসলাম চৌধুরী সেই ঋণ শোধের চেষ্টা করে যাচ্ছেন নীরবে, নিরলসভাবে। আর তার বুনে দেওয়া প্রতিটি তালবীজ যেন বলে যায়—একটি গাছ মানেই শুধু সবুজ নয়, একটি গাছ মানেই একটি ভবিষ্যৎ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...