ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) দেশটির একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন। ভুচিচের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কর্তৃক কুখ্যাত ‘যৌন অপরাধী’ জেফ্রি এপস্টেইনের নথিপত্র প্রকাশের ঘটনা থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই এই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। সদ্য প্রকাশিত ওই নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও উঠে এসেছে। সার্বিয়ান প্রেসিডেন্টের ভাষ্যমতে, অতীতেও বিল ক্লিনটনের নারী কেলেঙ্কারির মতো ঘটনার সময় বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ দেখা গেছে।
অন্যদিকে, তেহরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, ইরানে কোনো ধরনের হামলা হলে তা কেবল একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আমেরিকানদের জানা উচিত তারা যুদ্ধ শুরু করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। তবে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, ট্রাম্পের পাঠানো যুদ্ধজাহাজ দেখে ইরানি জাতি ভীত নয়। খামেনি বলেন, ‘আমরা কোনো যুদ্ধ বা অন্য দেশে আক্রমণ চাই না, কিন্তু কেউ আমাদের ওপর হামলা করলে পাল্টা কঠোর আঘাত হানা হবে।’
বর্তমানে আরব সাগরে অবস্থান করছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। এর সঙ্গে রয়েছে ছয়টি ডেস্ট্রয়ার ও তিনটি উপকূলীয় যুদ্ধজাহাজ। এর বিপরীতে ইরানও নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে পিছপা হচ্ছে না। রবিবার থেকে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে দুই দিনব্যাপী তাজা গুলিবর্ষণের নৌ-মহড়া শুরু করার কথা রয়েছে ইরানের। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন, মার্কিন বাহিনী তাদের আঙিনায় এসে খবরদারি করার চেষ্টা করছে। তবে এর মাঝেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে এবং তিনি একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের আশা করছেন। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানিও আলোচনার অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্প মূলত দুটি শর্তের কথা বলছেন—পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বন্ধ করা এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন থামানো।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও বর্তমানে বেশ নাজুক। দেশটির সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে প্রচুর প্রাণহানির খবর পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ১১৭ বলা হলেও, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে এই সংখ্যা অনেক বেশি। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির মতে এটি ৬ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে এবং নরওয়েভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস আশঙ্কা করছে নিহতের সংখ্যা ২৫ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। খামেনি অবশ্য এই বিক্ষোভকে একটি ‘ব্যর্থ অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর মধ্যেই শনিবার বন্দর আব্বাস ও আহভাজ শহরে পৃথক বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যা নিয়ে নানা গুঞ্জন থাকলেও কর্তৃপক্ষ একে ‘গ্যাস লিক’ বলে দাবি করেছে।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফ্রন্টেও বড় ধাক্কা খেয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে ইরানের চাবাহার বন্দর প্রকল্পের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখেনি ভারত। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরে ভারত এতদিন নিয়মিত অর্থায়ন করে আসছিল, যা আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় বাণিজ্যের জন্য পাকিস্তানের বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় নয়াদিল্লি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করার জবাবে, ইরানও ইইউর সদস্য দেশগুলোর সেনাবাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জানিয়েছেন, ইউরোপীয়রা আমেরিকার অন্ধ অনুসরণ করে নিজেদের পায়েই কুড়াল মেরেছে। সব মিলিয়ে সামরিক হুমকি, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি।