ঢাকা উত্তর সিটির ৬নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার চার্জশিটে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করে। বাপ্পি পুলিশ পরিচয়ে কলকাতার একটি বাসায় প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে আত্মগোপনে থাকেন বলে সংবাদ প্রচার হয়। জানা যায়, কলকাতার রাজরহাটের ওয়েস্ট বেড়াবেড়ি মেঠোপাড়া এলাকার ঝনঝন গলির চার তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় এ-থ্রি ফ্ল্যাটে ৬ জানুয়ারি রাতে ছিলেন বাপ্পি। এবার বেরিয়ে এল আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জানা গেছে, হাদি হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পি কলকাতায় রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পরবর্তী সময়ে ভারতে পালিয়ে যায় সে। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন নেতা তার সঙ্গে রয়েছে। এরপর গত বছরের সেপ্টেম্বরে অবৈধপথে দেশে প্রবেশ করে বাপ্পি। দ্বিতীয় বিয়ে করে পরে স্ত্রীকে নিয়ে ফের ভারতে চলে যায়। সেখান থেকেই পরিচালনা করে হাদি হত্যার পুরো মিশন। ওসমান হাদিকে গুলি করার পর শুটার ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীরকে নির্বিঘ্নে ভারতে পালানোর ব্যবস্থাও করে সে।
এদিকে, হাদি হত্যা মামলার চার্জশিটে অভিযুক্ত ১৭ জনের মধ্যে নির্দেশদাতা হিসেবে বাপ্পির নাম উল্লেখ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তবে বাপ্পিসহ ভারতে পলাতক অন্য খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পুলিশের দাবি, খুনিরা অবৈধ পথে ভারতে গেছে। ফলে, তাদের সেখানে অবস্থানের অফিশিয়াল তথ্যপ্রমাণ নেই। এ কারণে তাদের ফেরাতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইন্টারপোলের কাছে সহায়তা চাওয়া যাচ্ছে না। তবে আদালতের অনুমতি পেলে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হবে।
ডিবির তথ্যমতে, চার্জশিটভুক্ত ১৭ আসামি হলো-ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া তার সহযোগী মোটরসাইকেলচালক আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীর হোসেন (২৬), ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি (৪৩), আদম পাচারের দালাল ফিলিপ স্নাল (৩২), শুটার ফয়সালের ভগিনীপতি মুক্তি মাহমুদ (৫১), বোন জেসমিন আক্তার (৪২), বাবা মো. হুমায়ূন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), ফয়সালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মো. কবির (৩৩), নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), দালাল সিবিয়ন দিও (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), ফয়সালের ভগিনীপতি আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) এবং সহযোগী ফয়সাল (২৫)। এর মধ্যে ফয়সাল করিম মাসুদ, আলমগীর শেখ, তাইজুল ইসলাম বাপ্পি, জেসমিন আক্তার ও মুক্তি মাহমুদ এখনো পলাতক।
এ বিষয়ে ডিবির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কাছে সর্বশেষ তথ্য হলো-বাপ্পি এখন কলকাতায় আছে। সে সেপ্টেম্বরে অবৈধপথে বাংলাদেশে ঢুকে। তখন সে দ্বিতীয় বিয়েও করে। মাদারীপুরের শিবচরে এক মেয়েকে বিয়ে করে তাকে সঙ্গে নিয়ে ফের অবৈধপথে ভারতে চলে যায়। সেখানে বসেই হাদি হত্যার পরিকল্পনা করে।’
বাপ্পিকে দেশে ফেরাতে উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। আদালত অনুমতি দিলে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হবে। ইন্টারপোলের কাছে তখনই চিঠি লেখা যায়, যখন অফিশিয়াল চ্যানেলে পাওয়া যায় অপরাধী কোন দেশে আছে। অথবা আনঅফিশিয়াল চ্যানেলে যখন তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হন তখন আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে ফেরাতে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করতে পারেন।’
জানা গেছে, বাপ্পি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন কলকতার রাজারহাটের ওয়েস্ট বেড়াবেড়ি মেঠোপাড়া এলাকায় পুলিশ পরিচয়ে আত্মগোপনে রয়েছে।
হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাসের মাথায় গত ৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। চার্জশিটে ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। বলা হয়েছে, রাজনৈতিক কারণেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা অবস্থায় হাদির মাথায় গুলি করা হয়। মোটরসাইকেলে থাকা হামলাকারীরা পরিকল্পনা অনুযায়ী মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৮ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন হাদি। এরপর এ ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে গত ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় মামলা দায়ের করেন।
এ রকম আরো সংবাদ...