দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাজীনগর এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু একটি বাড়ি। এলাকার মানুষজন ভিড় করছেন সেখানে। কেউ একনজর দেখতে চান বিদেশি জামাইকে, কেউ তাঁর সঙ্গে ছবি তুলছেন। আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবি পোস্ট করে জানাচ্ছেন, তাঁদের এলাকায় এসেছে চীনের এক যুবক।
সেই যুবকের নাম ওয়াং জিয়াওপাং। তবে এখন তিনি পরিচিত ‘শুভ ইসলাম’ নামে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তিনি বিয়ে করেছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের হাজীনগর এলাকার তরুণী সানজিদা আক্তারকে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল তাঁদের সম্পর্ক। ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল হাজার হাজার কিলোমিটার। ভাষা ও সংস্কৃতিতেও ছিল বিস্তর পার্থক্য। তবু নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে একসময় দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসার সম্পর্ক।
সানজিদা আক্তার বলেন, ‘প্রথমে সাধারণ বন্ধুত্ব ছিল। পরে আমরা একে অপরকে জানতে শুরু করি। ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, আমাদের চিন্তাভাবনা ও জীবন নিয়ে স্বপ্নের মধ্যে অনেক মিল আছে। এরপরই আমরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিই।’
প্রেমের টানেই বাংলাদেশে আসেন ওয়াং জিয়াওপাং। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তাঁর নতুন নাম রাখা হয় শুভ ইসলাম। গত ২৭ জুলাই দুই পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
শুভ ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে এসে আমি খুবই ভালো অভিজ্ঞতা পেয়েছি। এখানকার মানুষ অনেক আন্তরিক। পরিবারের সবাই আমাকে আপন করে নিয়েছে। আমি নিজের ইচ্ছাতেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি। আমরা দুজন একটি সুন্দর ও সুখী জীবন গড়তে চাই।’
মেয়ের মা নাসীমা বেগম বলেন, ‘শুরুর দিকে আমরা কিছুটা চিন্তিত ছিলাম। কারণ ছেলেটি ভিন্ন দেশের মানুষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার ব্যবহার ও আন্তরিকতা দেখে আমাদের আস্থা তৈরি হয়েছে। মেয়ের সুখের কথা ভেবেই আমরা বিয়েতে সম্মতি দিয়েছি।’
সানজিদার ফুফু শাহীনুর বেগমের ভাষায়, ‘ছেলেটি খুব ভদ্র ও মিশুক। পরিবারের সবাইকে সম্মান করে। তাই এখন আমরা তার ওপর ভরসা রাখতে পারছি।’
এলাকার বাসিন্দাদের কাছেও বিষয়টি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, প্রযুক্তির এই যুগে দূরত্ব আর আগের মতো বাধা নয়। আবার কেউ কেউ কৌতূহল নিয়ে দেখছেন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির দুই মানুষের নতুন জীবনযাত্রা।
কনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা থামছেই না। বিদেশি জামাইকে ঘিরে যেন উৎসবের আবহ। কেউ শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, কেউ স্মৃতি হিসেবে ছবি তুলে রাখছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর সানজিদাকে চীনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে শুভ ইসলামের। তাঁদের প্রত্যাশা, দুই দেশ ও দুই সংস্কৃতির এই বন্ধন ভালোবাসা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে দীর্ঘদিন টিকে থাকবে।
হাজীনগরের সরু গলিতে দাঁড়িয়ে বিদেশি জামাইকে দেখতে আসা মানুষের ভিড় যেন আরেকবার মনে করিয়ে দেয়—ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব; ভালোবাসা কখনো কখনো সব সীমারেখাকেই অতিক্রম করে যেতে পারে।