• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম
১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা কেরানীগঞ্জে আমান প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত ১ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে স্ত্রী হত্যার অভিযোগে স্বামী গ্রেপ্তার ‘মজা করে কমেন্ট করেছি’, প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে মন্তব্যে যুবকের ৭ দিনের রিমান্ড সেই মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘মিথ্যা’ দাবি আইনজীবীর ওয়েবসাইট বন্ধ রেখেও সাইবার হামলার শিকার জনতা ব্যাংক কেরানীগঞ্জে যুব মহিলা লীগ নেত্রী হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, গ্রেফতার ৩ কেরানীগঞ্জে পরিত্যক্ত ভবনের পাশে অজ্ঞাত কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার ইরানে দ্বিতীয় দফা যুদ্ধের শঙ্কা, বিপদে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বাস খাদে পড়ে নিহত ৩, আহত ১৬

সাড়ে ১২শর সিলিন্ডার মিলছে না ২৫শতেও

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত : শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬

রাজধানী ঢাকায় এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডারের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ডিসেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১২৫৩ টাকা নির্ধারণ করলেও অনেক দোকানে এখন এর দাম রাখা হচ্ছে ২৫০০ টাকা। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ খুচরা ব্যবসায়ীদের।

শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ দোকানে এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও দাম অস্বাভাবিক। সাধারণত বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বেশি দিতে হয় ভোক্তাদের, কিন্তু এবারের বৃদ্ধি রেকর্ড ছাড়িয়েছে।

বাসাবো এলাকায় তিন-চার দিন আগেও ১৫০০-১৫৫০ টাকায় সিলিন্ডার মিললেও এখন তা পাওয়া দায়। যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দাম ২৫০০ টাকা পর্যন্ত। মাদারটেক এলাকার বাসিন্দা মো. সাইদুজ্জামান শরীফ বলেন, আমি সাধারণ মানুষ, আমার যে আয় তাতে ২৫০০ টাকা দিয়ে গ্যাস কেনা অসম্ভব ব্যাপার। এটা আমার আয়ত্তের বাইরে বলতে গেলে। আমার তো না খেয়ে থাকতে হবে। এখন আবার মাটির চুলা বানিয়ে লাকড়ি দিয়ে রান্নাবান্না শুরু করতে হবে। এ ছাড়া তো উপায় নেই। সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষ কীভাবে ২৫০০ টাকা দিয়ে গ্যাস কিনে খাবে?

মগবাজারেও একই চিত্র। তিন দিন আগে বেশি দামে মিললেও এখন সিলিন্ডারই নেই। আমবাগান এলাকার বাসিন্দা আসিফ মাহমুদ বলেন, আগের বাসায় তিতাস গ্যাস থাকলেও এখন ঝুঁকি নিয়ে সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে। কারণ এ এলাকার অধিকাংশ ভবনে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর বেশি খরচে সিলিন্ডারই ব্যবহার করতে হচ্ছে। কয়েক দিন ধরে মগবাজার এলাকায় গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ বাসাতেই রান্নাবান্না বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে খাবার আনতে হচ্ছে হোটেল থেকে। এভাবে কত দিন যাবে জানি না।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন নির্মিত অসংখ্য বহুতল আবাসিক ভবনে গ্যাসের সংযোগ বন্ধ থাকায় এসব ভবনের বাসিন্দারাও রান্নার জন্য এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। নিম্ন আয়ের অনেক মানুষও এখন এলপিজি নির্ভর। ফলে বিপুল ভোক্তাশ্রেণিকে জিম্মি করে অধিক মুনাফার সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজার এলাকার বহুতল আবাসিক ভবনের বাসিন্দা শিমুল হাসান বলেন, গত ২৮ ডিসেম্বর আমার বন্ধু যে দোকান থেকে ১৬৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছে, সেই সিলিন্ডারের দাম এখন ২২০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। এটা তো ঠিক হচ্ছে না।

মোহাম্মদপুরে চারটি বাসায় কাজ করেন খাদিজা বেগম। এর মধ্যে দুই বাসায় সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়। তিনি জানান, সিলিন্ডার গ্যাসের সংকটের কারণে গতকাল এক পরিবার বাইরে থেকে খাবার কিনে খেয়েছে।

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন সরবরাহ সংকটই এলপিজির দাম বাড়ার মূল কারণ। বাসাবোর সিলিন্ডার গ্যাসের খুচরা বিক্রেতা মো. নাদিম বলেন, খুবই সীমিত আকারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের এখানে ডিপো দুই জায়গায়। তারা সিন্ডিকেট করে সব বন্ধ রাখছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তারা কিছু কিছু দিয়েছে। কিন্তু আমরা যারা রিটেইলার (খুচরা বিক্রেতা), তারা কোনোভাবে সিলিন্ডার পাচ্ছি না। আর কিছু জায়গায় পাওয়া যায়, ওখানে দাম অনেক চড়া। বাড়তে বাড়তে ২৫০০ টাকা এখন। এ জন্য আর কিনিনি। আমার কাছ থেকে ১২ লিটার সিলিন্ডার হোলসেল চাইছে ২২০০ টাকা।

তিনি বলেন, আমার সংসারের অবস্থা ১২টা বেজে গেছে। ১৫ দিন ধরে আমাদের দোকান বন্ধ। কারণ গ্যাস ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে হোলসেল রেট যদি এত টাকা চায়, তা হলে এটা কিনব কত আর বিক্রি করব কত? মানুষের ওপর তো জুলুম হয়ে যাচ্ছে।

মোহাম্মদপুরের শেরশাহসুরী রোডে অবস্থিত বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের সামনে দেখা যায়, ক্রেতা খালি সিলিন্ডার নিয়ে এসেছেন। কিন্তু বিক্রেতা জানাচ্ছেন, নতুন করে সিলিন্ডার দেওয়া সম্ভব নয়। চড়া দাম হওয়ায় ডিস্ট্রিবিউটর থেকে সিলিন্ডার রাখেননি তিনি। বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের মো. মোস্তফা বলেন, তিন-চার দিন আগে ১৫৫০ টাকায় ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি করেছি। এখন দাম চাচ্ছে ১৮৫০ টাকা। তাই আমরা রাখিনি।

দাম বাড়ার কারণ ও সম্ভাব্য সমাধান
শীত মৌসুমে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। ফলে দামও কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকে। এবার সেই চাপের সঙ্গে যোগ হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজ সংকট। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ায় পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। এতে একদিকে ভাড়া বেড়েছে, অন্যদিকে চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়েছে আমদানিতে। আগের মাসের তুলনায় গত মাসে এলপিজি আমদানি কমে গেছে। যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়, সেখানে ডিসেম্বরে আমদানি নেমে এসেছে ৯০ হাজার টনে। আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় কিছু কোম্পানি এলপিজির দাম কিছুটা বাড়িয়ে রাখতে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বিইআরসি দাম নির্ধারণ করে। কিন্তু তাদের মাঠ পর্যায়ে এ দামটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তদারকি নেই। তাদের লোকবল নেই এগুলো মনিটর করার জন্য। ভোক্তা অধিদফতর বা জেলা প্রশাসন এদের সঙ্গে ইন্টারলিংক করে এ তদারকিটা করা যায়।

তিনি বলেন, যারা হোলসেল বিক্রেতা, তারাই এখানে ‘মানি মেকিংটা’ করছে। তারা যখন দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে তখন স্বাভাবিকভাবেই খুচরা বিক্রেতারা তার থেকে বেশি দামে বিক্রি করবে। এ কারণেই আসলে ১২০০ টাকা দাম নির্ধারণ হলেও এর দাম ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা হয়ে যাচ্ছে। এখানে কোনো কন্ট্রোলিং সিস্টেমই নেই।

সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে তিনি বলেন, বিইআরসি থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। বিইআরসি অথবা জ্বালানি মন্ত্রণালয় তাদের কাজ হবে হোলসেলসহ তাদের ডিস্ট্রিবিউটর যারা আছে, তাদেরও একটু মনিটরিংয়ের আওতায় আনা। এসবের মাধ্যমে তারা চাইলে দেখতে পারে কোথায় কোথায় গ্যাপ হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে যদি সমন্বয়ের কথা বলা হয়, তা হলে এটি ঠিক হবে। বিইআরসি অথবা মন্ত্রণালয় উদ্যোগ না নিলে এটা ঠিক হবে না।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ডিজি ফারুক আহম্মেদ বলেন, আমাদের বাজার অভিযান চলছে। আমরা কর্তৃপক্ষকেও বলেছি। জরিমানা হয়েছে অনেক জায়গায়। আমরা যতটা পারি করছি। এর কোনো প্রভাব তো বাজারে পড়ছে না- এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা কী করব? যারা এটি দেখে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বিইআরসি তাদের বলেন। তারা এ মূল্য নির্ধারণ করে। তাদের ম্যাজিস্ট্রেট আছে, পুলিশ আছে। তারা ওগুলো দিয়ে যেন আইন প্রয়োগ করে। আপনাদের মধ্যে সমন্বয় আছে কি না প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, না, ওরা আমাদের ডাকে না। আমরা ডাকলে ওরা আসে না। তারপরও আমরা যথাসম্ভব অভিযান পরিচালনা করছি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...