সাব্বির, জাবি প্রতিনিধি
১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি তৎকালীন চ্যান্সেলর রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আহসান যে বিদ্যাপীঠের উদ্বোধন করেছিলেন, আজ তা গৌরবময় ৫৫ বছর পূর্ণ করে ৫৬ বছরে পদার্পণের দ্বারপ্রান্তে।
‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আজ অনন্য এক উচ্চতায়। যুক্তরাজ্যের শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৫–২৬ (৯ অক্টোবর ২০২৫) প্রকাশিত র্যাঙ্কিংয়ের ফলাফলে শিক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য সূচকে মূল্যায়িত হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে অবস্থান করেছে। এবারের র্যাঙ্কিংয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় ৮০১–১০০০ ব্যান্ডে জায়গা করে দেশের মধ্যে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছে।
তবে এই বিশ্বজয়ের মুকুটের আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু রূঢ় বাস্তবতা। দীর্ঘ তিন দশক পর জাকসু (জাকসু নির্বাচন ২০২৫-এ সম্পন্ন) কার্যকর হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত ৫৫ বছরে এমন কিছু মৌলিক সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে, যা একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
দেশসেরা শিক্ষক ও গবেষকদের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক খ্যাতি পেলেও, অভ্যন্তরীণ অপূর্ণতার দীর্ঘ তালিকা প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাবনাকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে।
১. ডিজিটাল বাংলাদেশে ‘এনালগ’ প্রশাসন ও সেকেলে ওয়েবসাইট
বাংলাদেশ যখন ২০২৬ সালে এসে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার চূড়ান্ত ধাপে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তখনো যেন বিংশ শতাব্দীর ধুলোবালি মাখা ফাইলের স্তূপে আটকা পড়ে আছে। প্রতিষ্ঠার ৫৫ বছর পার করলেও বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অটোমেশন বা পেপারলেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গড়ে তুলতে পারেনি।
তথ্যের আকাল ও সেকেলে ওয়েবসাইট:
বর্তমান যুগে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় মেলে তার ওয়েবসাইটে। অথচ জাবির ওয়েবসাইটটি দেখলে মনে হয় এটি কোনো পরিত্যক্ত তথ্যভাণ্ডার। দীর্ঘ তাগাদার পরও অধিকাংশ শিক্ষক তাদের প্রোফাইল হালনাগাদ করেন না। ফলে আন্তর্জাতিক গবেষক বা শিক্ষার্থীরা যখন জাবির কোনো তথ্য খুঁজতে যান, তারা অসম্পূর্ণ ও ভুল তথ্য পান বলে জানা গেছে।
অব্যস্থাপনার ডিজিটাল রূপ:
ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিভাগীয় ফি জমা বা পরীক্ষার ফলাফল—প্রতিটি ধাপে শিক্ষার্থীদের এখনো ম্যানুয়াল জটিলতায় ভুগতে হয়। র্যাঙ্কিংয়ে দেশসেরা হওয়ার দাবি করা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ‘ডিজিটাল দৈন্য’ কেবল হতাশাজনকই নয়, বরং লজ্জাজনক।
অনলাইন সোর্সের প্রতিফলন:
বৈশ্বিক মান মূল্যায়নে (যেমন: Webometrics বা THE Ranking) ওয়েবসাইটের তথ্য ও দৃশ্যমানতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অথচ জাবি প্রশাসন ৫৫ বছরেও একজন পেশাদার ওয়েব ডেভেলপার টিম বা ডেটা ম্যানেজমেন্ট সেল তৈরি করতে পারেনি, যা তাদের আধুনিক শিক্ষা বিমুখতারই বহিঃপ্রকাশ।
২. শ্রেণিকক্ষ সংকট: অবকাঠামোগত দৈন্যের চরম বহিঃপ্রকাশ
দেশের অন্যতম প্রথম সারির একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েও ৫৫ বছরে এসে শ্রেণিকক্ষ সংকটের মতো মৌলিক সমস্যায় ভোগা জাবি প্রশাসনের চরম অদূরদর্শিতারই বহিঃপ্রকাশ।
ভুক্তিভোগী বিভাগ: আইন অনুষদ, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ, ইংরেজি বিভাগ, এবং বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা এখনো ধুঁকছেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটে তীব্র শ্রেণিকক্ষ সংকট বিদ্যমান।
প্রশাসনের অজুহাত: প্রশাসন নির্মাণাধীন লেকচার থিয়েটারের দোহাই দিলেও দীর্ঘসূত্রতা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে ব্যাহত করছে।
৩. শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে অস্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি
৫৫ বছরেও জাবিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি শতভাগ স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নীতিমালা প্রশ্নাতীত থাকেনি। অভিযোগ রয়েছে, একাডেমিক যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও আঞ্চলিকতা নিয়োগের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে ‘কম একাডেমিক, বেশি রাজনৈতিক’ মনোভাবের কারণে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত মান দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। মেধার অবমূল্যায়ন করে অনুগতদের পদায়নের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানটিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
৪. প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের অভাব: জ্ঞানের প্রসারে বড় বাধা
অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি নিজস্ব ‘ইউনিভার্সিটি প্রেস’ বা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেনি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানের কারখানা নয়, বরং জ্ঞান তৈরির কেন্দ্র। নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা না থাকায় শিক্ষকদের মৌলিক গবেষণা ও গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপিগুলো বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছাতে পারছে না, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ডিসিপ্লিনের অপ্রতুল প্রসারের অন্যতম কারণ।
৫. গবেষণার অপ্রতুল বাজেট ও সেকেলে ব্যবস্থাপনা
যদিও ‘ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’ দেশের সর্ববৃহৎ গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, তবে এর পূর্ণাঙ্গ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় বাজেটের একটি নগণ্য অংশ গবেষণায় বরাদ্দ থাকে। গবেষণার জন্য আধুনিক ‘সেন্ট্রাল রিসার্চ সেল’ বা ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনায় এখনো পেশাদারিত্বের অভাব পরিলক্ষিত হয়।
প্রশাসন যদি আধুনিক অবকাঠামো, ডিজিটাল অটোমেশন এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এই সাফল্য ধরে রাখা অসম্ভব
৬. পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সৌন্দর্যের নিচে বিষাক্ত ক্ষত
পাখিদের অভয়ারণ্য এবং প্রজাপতি পার্কের জন্য জাবি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হলেও এর সুয়ারেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চরম আদিম যুগের। হলের পয়ঃনিষ্কাশন নালাগুলো সরাসরি প্রাকৃতিক লেকে গিয়ে মিশছে। ফলে শীতের অতিথি পাখি ও লাল শাপলার পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে। প্রকৃতির প্রতি এই প্রশাসনিক উদাসীনতা দীর্ঘ মেয়াদে ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
৭. একাডেমিক ডিসিপ্লিন ও আন্তর্জাতিকিকরণে পিছিয়ে
র্যাঙ্কিংয়ে সাইটেশন ও টিচিং কোয়ালিটিতে এগিয়ে থাকলেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা জাবিতে এখনো নগণ্য। বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো আধুনিক ডরমিটরি বা আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম প্রসারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।
উপসংহার ও আগামীর প্রত্যাশা
১৯৭০-৭১ শিক্ষাবর্ষে মাত্র ১৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া জাবি আজ আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত। জাকসু সচল হওয়া এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থান দখল করা অবশ্যই বড় অর্জন। তবে ৫৫ বছরের এই মাইলফলকে দাঁড়িয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
এখনই সময়—সেকেলে ওয়েবসাইট আধুনিক করা, শ্রেণিকক্ষ সংকট স্থায়ীভাবে নিরসন করা, এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এনে ‘মেধাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা। জাহাঙ্গীরনগর কেবল লাল ইটের স্থাপনা বা অতিথি পাখির লেক নয়, বরং এটি হওয়া উচিত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আধুনিক ডিজিটাল বিদ্যাপীঠ।
সাফল্যের এই মুকুট তখনই অর্থবহ হবে, যখন লাল ইটের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো মুছে যাবে। ৫৬ বছরে পা রাখার প্রাক্কালে জাহাঙ্গীরনগর কি পারবে তার ‘এনালগ’ খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে, নাকি শীর্ষস্থানের এই গৌরব কেবল এক দশকের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে ঢেকে রাখার রঙিন প্রলেপ হয়েই থাকবে?