আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। এরপরই পর্দা উঠছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে ৪৮ দলের এই ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে বইছে উন্মাদনা। তবে সেই উন্মাদনার পারদ যেন একটু বেশিই চড়েছে ঢাকার সাভারে।
সাভারের প্রবেশপথে আমিনবাজার মহাসড়কের পাশে উড়ানো হয়েছে এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দেশের পতাকা। বহুতল ভবনের ছাদ থেকে শুরু করে অলিগলি—সবখানেই উড়ছে ফুটবলপ্রেমীদের প্রিয় দলের পতাকা। জার্সি গায়ে ফুটবল ভক্তদের আনাগোনায় সাভার যেন রূপ নিয়েছে এক মিনি বিশ্বকাপে।
১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এবারের ২৩তম আসরটি নানা কারণেই ঐতিহাসিক। প্রথমবারের মতো ৩২টি দলের পরিবর্তে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ। উত্তর আমেরিকার ১৬টি ভেন্যুতে ৪১ দিন ধরে চলবে ১০৪টি ম্যাচের এই মহারণ।
সাভারের প্রবেশপথেই বিশ্বকাপের আবহ
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আঁচ দূর প্রবাসে বসেও বিন্দুমাত্র কমতে দিচ্ছেন না সাভারের ফুটবলপ্রেমী মানুষ। সাভার উপজেলার প্রবেশপথ আমিনবাজার এলাকার মহাসড়কের পাশেই সাভারবাসীর পক্ষ থেকে ওড়ানো হয়েছে ৪৮টি দেশের ৪৮টি পতাকা। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে সাভার যেন কোনো আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পাড়া। সাভারে ঢুকতেই এই পতাকার মেলা যেন বিশ্বকাপের আমেজ দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে আগমনকারীদের। সাভারের আকাশ এখন রঙ-বেরঙের পতাকার দখলে।
পতাকা উত্তোলনকারী যুবকদের মধ্যে আমিনবাজারের উচ্ছাস আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা যদিও ৪৮টা পতাকা লাগিয়েছি, কিন্তু সবার প্রথমে আছে কিন্তু বাংলাদেশ। আমরা বাংলাদেশের পতাকাটা সবার আগে লাগিয়েছি। আমি ব্রাজিল সাপোর্ট করি, আমাদের হেক্সা মিশন ইনশাল্লাহ এবার হবে।
ব্রাজিল সমর্থকরা টানান বিশাল পতাকা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ব্রাজিল সমর্থকরা টানান বিশাল পতাকা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
আমিনবাজার এলাকার আরেক যুবক আবিদ হাসান বলেন, এবার ফিফাতে যেহেতু ৪৮টা দেশ অংশগ্রহণ করছে, তাই আমাদের সাভার আমিনবাজারের সব বড় ভাই-ছোট ভাই আমরা সবাই একত্রে মিলে এই উদ্যোগ নিয়েছি যে- ৪৮টা পতাকা একত্রে উড়াব একটা উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করতে। আমাদের যার যার নিজস্ব দল আছে, যেমন আমি আর্জেন্টিনা করি, আমার দল এবার নিয়ে চারবার চ্যাম্পিয়ন হবে- আমি এটা আশা করি। সবশেষে আমি বলতে চাই- সবাই আমরা বাংলাদেশকে ভালোবাসি। আমাদের হৃদয়ে বাংলাদেশ এবং আমি আর্জেন্টিনাকেও ভালোবাসি। ইনশাআল্লাহ আমরা খুব আশাবাদী যে আগামীতে আমাদের বাংলাদেশও এই ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপে অংশগ্রহণ করবে।
ছাদে ছাদে পতাকার লড়াই, চায়ের দোকানে আড্ডা
সাভারের বিভিন্ন বহুতল ভবনের ছাদে ছাদে উড়ছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের বিশাল বিশাল পতাকা। নিজ বাড়ির ছাদে পছন্দের দলের পতাকা উড়িয়ে ফুটবল খেলার প্রতি গভীর ভালোবাসার জানান দিচ্ছে সাভারবাসী।
৫৫ ফুট পতাকা বানানো আর্জেন্টিনা ভক্ত সিয়াম আহমেদ বলেন, ‘এখন সাভারে তো অনেক পতাকা উড়ছে। কারণ আমাদের আমিনবাজার ইউনিয়নে প্রত্যেকটা গ্রামে অনেক পতাকা উড়ে বিশ্বকাপের এই সময়। আমি আর্জেন্টিনাকে খুব ভালোবাসি, কারণ আমি আর্জেন্টিনার ছোটকাল থেকে করি। আর আমার বাসার ছাদে একটা ৫৫ ফুট আর্জেন্টিনার পতাকা লাগাইছি। এটা ইতোমধ্যেই অনেক ভাইরাল হইছে ফেইসবুকে। ইনশাল্লাহ এবার বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা জিতবে।’
argentina bus
আর্জেন্টিনার পতাকা ও মেসির ছবিতে সাজানো হলো বাস
শুধু ছাদেই নয়, রাস্তাঘাট, বাজার কিংবা চায়ের দোকানে প্রিয় দলের জার্সি গায়ে চলছে জমজমাট আড্ডা। কেউ কেউ আবার রংতুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন পছন্দের ফুটবল দলের পতাকা। জার্সি গায়ে তরুণরা প্রিয় দলের পতাকা হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে অলিগলিতে। ২০২৬-এর খেলায় পছন্দের দল বিজয়ী হয়ে ছিনিয়ে নেবে বিশ্বকাপ—এমন প্রত্যাশায় একে অপরের সঙ্গে মেতে উঠেছেন তর্ক-বিতর্ক আর হাসি-ঠাট্টায়।
আশুলিয়ার দক্ষিণ গাজীরচট এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার হাদিসুর রহমান বলেন, সাভার-আশুলিয়ায় প্রায় সবাই ফুটবলপ্রেমী। আমরা ছোট থেকে বিশ্বকাপ পছন্দ করি। আমরা দেখেছি পুরো সাভারের মধ্যে এমনকি পুরো বাংলাদেশের মধ্যে আমিনবাজারে সব সময় পতাকা ওড়ানোর মধ্যে সব সময় সেরা। আমি মনে করি এই যে ব্রাজিলের সাপোর্টার বা আর্জেন্টিনার সাপোর্টার, কোনো ভেদাভেদ নাই। তা আপনারাও ভেদাভেদ করবেন না।
ব্রাজিল দলের সমর্থক যুবক রায়ান বিন আমিন বলেন, ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসায় আমি এ পর্যন্ত দুটি পতাকা বানিয়েছি। একটা জানালায় লাগিয়েছে, আরেকটা ছাদে। আসলে ২০২২ সালে আমরা আশা করেছিলাম যে ব্রাজিল ওয়ার্ল্ড কাপ জিতবে। যেহেতু আমাদের নেইমারের ফর্ম ভালো ছিল না, এর জন্য জিততে পারে নাই। আশা করছি, ২০২৬ সালে আমরা ভালো কিছু করব।
জার্সি-পতাকা বিক্রির ধুম, বড় পর্দায় খেলা দেখার প্রস্তুতি
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সাভারের স্থানীয় দোকানে দোকানে পতাকা আর জার্সি বিক্রির ধুম। চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ—সবাই কিনছেন পছন্দের দলের জার্সি। মেতে উঠেছেন বিশ্বকাপের উন্মাদনায়। ফুটবলপ্রেমীরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলবেঁধে, আয়োজন করে প্রজেক্টরের মাধ্যমে বড় পর্দায় বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ উপভোগ করার।
সাভারের অন্ধ মার্কেটে পতাকা কিনতে আসা আর্জেন্টিনা সমর্থক আশুলিয়ার ডেন্ডাবর এলাকার যুবক আরমান মাহমুদ বলেন, আমি মূলত ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। ম্যারাডোনার খেলা ভালো লাগত। আর মেসি হচ্ছে ম্যারাডোনার শিষ্য। তাই মেসিকেও ভালোবাসি, আর্জেন্টিনাকেও ভালোবাসি। ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনা করি, আর এবার ইনশাআল্লাহ চতুর্থবারের মতো আমরা কাপ নেব।
বাড়ির ছাদে বিশাল পতাকা টানিয়েছেন আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বাড়ির ছাদে বিশাল পতাকা টানিয়েছেন আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ব্রাজিল সমর্থক আশা আক্তার এসেছেন সাভারের অন্ধ মার্কেটে পছন্দের দলের জার্সি কিনতে। তিনি বলেন, ‘আমি ব্রাজিল সাপোর্ট করি। সব সময় দলের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করি, এবারও ভালোই হবে। এবার ফাইভ স্টারের জায়গায় সিক্স স্টার হবে আশা করি। আমার বাসার সবাই ব্রাজিল, শুধু আমার বড় বোন আর্জেন্টিনা। আমি সব সময় বিশ্বকাপ আসার আগে অনেক এক্সাইটেড থাকি। আর এবারও আমি অনেক এক্সাইটেড। আর এবার যেহেতু খুব বেশি দল নিয়ে বিশ্বকাপ হচ্ছে, তাই আরও বেশি খুশি আমি। অবশ্যই কনফিডেন্স আছে ব্রাজিল জিতবে। আর হারুক বা জিতুক, আমি সব সময়ই ব্রাজিল, ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিল।’
জার্সি কিনতে আসা ব্রাজিল সমর্থক সোহেল রানা বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশী এবার আমাদের হেক্সা পূরণ হবে। হ্যাঁ, এখন আমরা টেনশনে আছি যে আমাদের যে স্টারগুলো আছে, এইখানে আরেকটা স্টার আমরা কোথায় অ্যাড করব? সেটা নিয়ে একটু টেনশনে আছি আরকি। বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হইলো, উপরে যে একটু ফাঁকা প্লেস আছে, এইখানে ভাবছি যে আরেকটা স্টার আমরা অ্যাড করে দিতে পারব, ইনশাআল্লাহ।’
ব্রাজিল সমর্থক সাভার থানা রোড এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ মোহাম্মদ মাহফুজ বলেন, ‘ছোটকাল থেকে ব্রাজিলের খেলার আর্ট দেখে দেখেই কিন্তু ব্রাজিলের ভক্ত হয়ে উঠছি। আমি মনে করি, কাপ পেল কি পেল না সেটা বড় কথা না, জিনিসটা হচ্ছে যে খেলার মধ্যে যদি আর্ট খুঁজতে যান, খেলার যে প্রচ্ছন্নতা ও সব কিছু মিলায় যে জিনিসটা, সেটা কিন্তু পাবেন ব্রাজিলের খেলার মধ্যে। ইনশাআল্লাহ এবার জয় হবেই, ব্রাজিলের।’
সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার প্রত্যাশা
বিশ্বকাপের এই টানটান উত্তেজনা ও আনন্দের মধ্যে যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, এমনটিই আশা করছেন স্থানীয় সুশীল সমাজ ও প্রশাসন।
সাভারের স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইনস্টিটিউটের আজীবন সদস্য কবি মুহম্মদ শামসুল হক বাবু এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা আসলে সাভারবাসী চাচ্ছি যে আমাদের সম্প্রীতির বন্ধন, মেলবন্ধন যাতে বজায় থাকে। এই খেলা নিয়ে অনেক সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায়। আপনারা জানেন যে, বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গায় এই খেলা নিয়ে রাজনীতিও হয়। এই ধরনের নোংরা রাজনীতি যাতে আমাদের ভেতর না থাকে। আমরা যে যে-ই দলই করি না কেন, আর্জেন্টিনা কেউ করবে—আমি যেমন আর্জেন্টিনা করি, কেউ ব্রাজিল করবে, কেউ স্পেনের সাপোর্ট করবে, কেউ জার্মানির। এভাবে যে যে-ই দলই করুক না কেন, হার-জিত থাকবে। তবে, আমাদের মিলেমিশে থাকতে হবে। খেলাটা যেন আমাদের রাজনীতির ময়দানে চলে না আসে। খেলাকে স্রেফ খেলা হিসেবে আমরা উপভোগ করব এবং আমরা শান্তিপূর্ণভাবে এই খেলা দেখব, সাপোর্ট করব যার যার মতো করে। সর্বশেষ যে জিতবে, সে বিজয়ী হবে এবং সেটাই আমরা মেনে নেব।
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ছাড়াও বাড়ির ছাদে বিভিন্ন দেশের পতাকা টানানো হয়েছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ছাড়াও বাড়ির ছাদে বিভিন্ন দেশের পতাকা টানানো হয়েছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, খেলার আনন্দ প্রকাশে যেন কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, সেদিকে প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আসর ফুটবল বিশ্বকাপ হচ্ছে। পুরো সাভার উপজেলার বিভিন্ন ভবনে যুবকরা তাদের পছন্দের দলের পতাকা উড়িয়েছেন। বিশেষ করে আপনারা জানেন, আমাদের আমিনবাজার এলাকায় হাজার হাজার পতাকা দেখা যাচ্ছে। এটা আনন্দ-উৎসবের বিষয়, যা মাসজুড়ে থাকবে। এই উৎসবের ভেতরেও যাতে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে বা এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বা পতাকা টাঙানোকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অরাজকতা বা বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি না হয়, সে লক্ষ্যে আমাদের নজরদারি রয়েছে।
ইউএনও বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাও নজরদারি করবে, একই সঙ্গে আমাদের থানা পুলিশ যারা আছেন তারাও নজরদারি রাখবেন। অবশ্যই আমরা সদা প্রস্তুত রয়েছি, এই আনন্দের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ না হয়। এ রকম কিছু হলে আমরা উপজেলা প্রশাসন থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।
এক সুতোয় বাঁধা ফুটবল প্রেম
বিশ্বকাপের খেলা হাজার মাইল দূরে উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হলেও তার স্পন্দন কিন্তু স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যাচ্ছে সাভারের এই অলিগলিতে। প্রিয় দলের প্রতি এই নিঃশর্ত ভালোবাসাই প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি এক পরম আবেগের নাম। যা দূরত্বের দেয়াল ভেঙে জাতিধর্ম-নির্বিশেষে সবাইকে মিলিয়ে দেয় এক সুতোয়।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই টানটান উত্তেজনা আর উৎসবের আমেজে ভরপুর থাকবে সাভারের এই জনপদ—এমন প্রত্যাশা এখানকার ফুটবলপ্রেমীদের।