• বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০১:২৮ পূর্বাহ্ন

প্রেসক্রিপশন ছাড়া ব্যথার ওষুধ খেয়ে কিডনি বিকল

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া দেশে একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সামান্য মাথাব্যথা, গ্যাস্ট্রিক বা শরীর ব্যথায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ সেবন করেন অনেকে। তবে এমন প্রবণতা ধীরে ধীরে ডেকে আনছে কিডনি বিকল, লিভার অকার্যকরসহ নানা জটিল রোগ।

শরীয়তপুরের বাসিন্দা আরব আলী (৫৫)। বছরখানেক আগে তার দুটি কিডনিই বিকল হয়ে যায়। সঙ্গে আছে ডায়াবেটিসের সমস্যা।

প্রতি মাসে রাজধানীর জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও ইউরোলজি হাসপাতাল এবং বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। শুধু চিকিৎসার পেছনেই মাসে খরচ হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এই ব্যয় মেটাতে একমাত্র সম্বল মুদি দোকানটিও বিক্রি করে দিতে হয়।

গত ১০ জুন কিডনি হাসপাতালের সিঁড়িতে কথা হয় আরব আলীর সঙ্গে। জানান, কিডনি বিকলের বহু আগে থেকেই সামান্য অসুস্থতায়ও ওষুধ খেতেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘একসময় কৃষিকাজ করতাম, পরে শরীর না চলায় মুদি দোকান দেই। অনেক সময় শরীর ব্যথা করত, গ্যাসের সমস্যা দেখা দিলে বাজারে ফার্মেসিতে গিয়ে বললে ওষুধ দিয়ে দিত।’

আরব আলী একা নন। দেশের বহু মানুষ এভাবে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই পাড়ার ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনেন।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যখন ওষুধের অপব্যবহার দিন দিন নিয়ন্ত্রণে আনছে, সেখানে বাংলাদেশে চলছে উল্টো চিত্র।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৬২ শতাংশই যায় কেবল ওষুধের পেছনে। অথচ বিশ্বব্যাপী গড়ে এ হার মাত্র ১৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএ-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবায় ওষুধ ব্যয়ের হার যুক্তরাজ্যে ৯ শতাংশ, কানাডায় ১০ শতাংশ, ব্রাজিলে ১৩ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় ১৪ শতাংশ। ফ্রান্সে ১৫, জার্মানি-জাপান-ইতালিতে ১৭, স্পেনে ১৮ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০ শতাংশ।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞ

কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শেখ মইনুল খোকন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ওষুধ একটা কেমিক্যাল। ফলে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহারের ভয়াবহতা অনেক বেশি। অনেকে সাধারণ সমস্যায়ও দীর্ঘদিন ধরে মেডিসিন নেয়। অথচ ডায়াবেটিসের মতো রোগ দেখা দিলেই কেবল দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ খাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয়ভাবে একটা গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেটও খাওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত ওষুধের ফলে পেটের অ্যাসিডিটির পিএইচ মেইনটেইন হয় না। এটি পেটের অন্যান্য রোগ ডেকে আনে। কিডনি বিকল ও লিভার অকার্যকরের মতো জটিলতা দেখা দেয়।’

সমস্যা কেবল রোগীর অভ্যাসে নয়, চিকিৎসা ব্যবস্থার কাঠামোতেও। এ বিষয়ে ডা. শেখ মইনুল খোকন বলেন, ‘চিকিৎসা দিতে গিয়ে রোগীর একাধিক রোগের (মাল্টিপল ডিজিজ) জটিলতা থাকলে কিংবা যথাযথ রোগ নির্ণয় করা না গেলে ওষুধের ব্যবহার বেড়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘ভারতে বিভিন্ন ওষুধের অনেক কার্যকর কম্বিনেশন (যৌথ উপাদান) পাওয়া গেলেও আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে সিঙ্গেল জেনেরিক ওষুধ আলাদাভাবে দিতে হয়, যার ফলে রোগীর ওষুধের সংখ্যা বাড়ে। আর মাল্টিপল ওষুধ ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, রোগী ঠিকমতো ডোজ গ্রহণ করতে পারে না, অনেক সময় গ্যাপ দেয়। এতে করে জটিলতা আরও বাড়ে।’

দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্য ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র

শুধু ওষুধের অপব্যবহারই নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যয়েও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করে বাংলাদেশ। মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয়ে আফগানিস্তান যেখানে ৮২ ডলার ব্যয় করে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যয় করে মাত্র ৫৮ ডলার। নেপালে এই ব্যয় ৬৭ ডলার, ভারতে ৭৪, মিয়ানমারে ৭১, ভুটানে ১০৪, শ্রীলংকায় ১৫৭ এবং মালদ্বীপে এক হাজার ৫৭ ডলার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ ও জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের পরামর্শ দিলেও বাংলাদেশ কখনও সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেনি।

পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে রোগীর নিজস্ব ব্যয়ের ক্রমাগত বৃদ্ধি। ২০১২ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থায়ন কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কৌশলপত্র তৈরির সময় এই হার ছিল ৬৪ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে তা কমেনি, বরং আরও বেড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আগে যে ধরনের রোগ ছিল, এখন তার ধরন বদলে গেছে। বর্তমানে অসংক্রামক রোগ বেশি, যা ব্যক্তিগত রোগ। খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা ও বৈশ্বিক প্রভাবে রোগের ধরন পাল্টে যাওয়ায় রোগী বাড়ছে। ফলে বাজারে নতুন নতুন ওষুধ এসেছে। ওষুধের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের লাগাম টানতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’

সরকারের উদ্যোগ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। এবারই প্রথমবারের মতো এই খাতে বরাদ্দ জিডিপির এক শতাংশ ছাড়িয়েছে। মোট বরাদ্দের পরিমাণ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ওষুধের ব্যবহার কমাতে হলে রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান সরকার সেই পথেই এগোচ্ছে। আমরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়েছি। তবে শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষকেও অপ্রয়োজনে ওষুধের ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...