কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরে আসার পথে এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া এক লাখ পিস ইয়াবা গায়েব ও আত্মসাতের অভিযোগে অবশেষে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) রাত ৯টার দিকে তাকে কোতোয়ালি থানা থেকে প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক, প্রশাসন ও অর্থ) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানান, কোতোয়ালি থানার ওসিকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত বছরের ৮ ডিসেম্বর কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন পুলিশ বক্সে এই ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠে, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে নিয়মিত মামলার পরিবর্তে ইয়াবা বহনকারীকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন বাকলিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন, যিনি পরবর্তীতে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার ওসির দায়িত্ব পান।
বিষয়টি দীর্ঘদিন গোপন থাকার পর, ইয়াবা বহনকারী পুলিশ সদস্যের সঙ্গে অন্য এক ব্যক্তির কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হলে সিএমপি প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। অতিরিক্ত কমিশনার মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে প্রধান করে গঠিত এই তদন্ত কমিটি ঘটনার সত্যতা পেয়ে গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠায়। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত ওসি আফতাব উদ্দিন ও বাকলিয়া থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ করা হয়।
যেভাবে আত্মসাৎ করা হয় ইয়াবা
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলা আদালতের বিচারকের গানম্যান (কনস্টেবল) ইমতিয়াজ হোসেন এক মাদক কারবারির কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ নিয়ে ঢাকাগামী দূরপাল্লার বাসে ওঠেন। বাসটি শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার এএসআই সাদ্দাম হোসেন ও পুলিশের এক সোর্স তল্লাশি চালিয়ে ইমতিয়াজকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নিয়ে যান।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, পুলিশ বক্সের ভেতর বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ এবং এসআই আল–আমিন সরকার উপস্থিত ছিলেন। সেখানে লাগেজ খুলে ১০টি প্যাকেটে থাকা মোট ১ লাখ ইয়াবা নিশ্চিত হওয়ার পর তা পুলিশ সদস্যরা নিজেদের হেফাজতে নেন এবং খালি লাগেজসহ ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেন। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিনের সরাসরি নির্দেশেই এই ইয়াবা গায়েব ও আসামি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া তিনি ঘটনা লুকাতে সিসিটিভি ফুটেজও ধ্বংস করেন।
অবশ্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিন দাবি করেন, ‘ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি তা আত্মসাৎ করিনি এবং ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।’
পুলিশের নিয়ম অনুযায়ী, কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত কর্মকর্তাদের সিএমপি কমিশনার বরখাস্ত করতে পারলেও পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বরখাস্তের এখতিয়ার কেবল পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি)। এই আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ওসির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদর দপ্তরের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হচ্ছিল। যার ফলে এত দিন তাঁর বিরুদ্ধে প্রত্যাহারের মতো কোনো প্রাথমিক পদক্ষেপও নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত ৯ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সবশেষ গত ৯ জুন বাকলিয়া থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদকে বরখাস্ত করা হয়।
এর আগে বরখাস্ত হওয়া অন্য কর্মকর্তারা হলেন এসআই মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, এএসআই সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান, কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না এবং অভিযুক্ত গানম্যান কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন।
এদিকে ঘটনার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আত্মসাৎকৃত ইয়াবা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং প্রধান অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়নি বলে জানিয়েছেন সিএমপি প্রশাসন।