• মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:১৩ অপরাহ্ন

৮ হাজার টাকার পিয়ন থেকে কোটিপতি আলাউদ্দিন

রানা আহমেদ
প্রকাশিত : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

মাত্র ৮ হাজার ২৫০ টাকা বেতনে অফিস সহায়ক (পিয়ন) হিসেবে চাকরি শুরু। অথচ এক যুগ পার না হতেই কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে।

ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য, কাজ না করেই বিল উত্তোলন এবং প্রকল্প বরাদ্দে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এসব কর্মকাণ্ডে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার দক্ষিণ শ্যামপুর গ্রামের সুলতান আহমেদের ছেলে আলাউদ্দিন তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। পরিবারের অন্য দুই ভাইয়ের একজন শিক্ষক ও অন্যজন ঠিকাদার। তবে সরকারি চাকরিতে নিম্নপদে কর্মরত থেকেও অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে চৌদ্দগ্রামে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের বরাদ্দ পেতে হলে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন আলাউদ্দিন। তার সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া বরাদ্দ পাওয়া কিংবা বিল ছাড় করানো প্রায় অসম্ভব।

ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চৌদ্দগ্রামে ৬৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এসব প্রকল্পে টিআর খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার ৯৭৪ টাকা এবং কাবিটা খাতে ২ কোটি ৯১ লাখ ৬১ হাজার ৬৬১ টাকা। পাশাপাশি চাল ও গম মিলিয়ে বরাদ্দ ছিল ৩৪৬ টন খাদ্যশস্য।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রকল্পেই বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হয়নি। কোথাও নামমাত্র কাজ, কোথাও নিম্নমানের কাজ করে পুরো বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে উপজেলা কমিটির ২০ শতাংশ রিজার্ভ প্রকল্পের কয়েকটিতে কেবল কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে প্রায় ১৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক প্রকল্পে কাজের চেয়ে কাগজে ব্যয় দেখানো হয়েছে কয়েকগুণ বেশি। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সরকারি অর্থ লুটপাটের একটি নীরব উৎসবে পরিণত হয়েছে পুরো কার্যক্রম।

অনুসন্ধানে আলাউদ্দিনের সম্পদের বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে। কুমিল্লা নগরীর আনোয়ারা হাউজিং এলাকায় তার নামে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া বেনামে আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিজ গ্রাম দক্ষিণ শ্যামপুরে নির্মাণাধীন রয়েছে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “সরকারি অফিসের একজন পিয়নের এত টাকা আসে কোথা থেকে—এটাই এখন মানুষের প্রশ্ন। মাঝেমধ্যে তার স্ত্রী গাড়ি নিয়ে এলাকায় আসেন।”

আলাউদ্দিনের পরিবারের এক সদস্যও প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন, কুমিল্লা শহরে তার দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর মধ্যে একটি তিনি আলাউদ্দিনের কাছ থেকে কিনেছেন এবং অন্যটি আলাউদ্দিন নিজে ব্যবহার করেন।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমার নামে যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে, তার অধিকাংশই মিথ্যা।”

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ক্যামেরা দেখে সরে যান বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিবেদকরা। পরে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক ও ত্রাণ পুনর্বাসন বিভাগে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে থাকায় তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আবেদ আলী  বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...